সমুদ্রে জীবন – ১৭

যে জাহাজটির গল্প নীচে বলা হয়েছে, এটা তারই একটা ছবি। খুব সম্ভবত দক্ষিণ কোরিয়ার উলসান/পুসান-এর আশেপশে কোথাও ছবিটি তোলা হয়েছে।

mariner77_1341768001_1-shp
[এর ঠিক আগের র্পবটা রয়েছে এখানে: সমুদ্রে জীবন – ১৬]
“সমুদ্রে জীবন” সিরিজটায় আসলে তেমন কোন ধারাবাহিকতার ব্যাপার নেই, প্রয়োজনও নেই তেমন – কখনো হয়তো একটা পর্বে বর্ণিত ঘটনাগুলোর পরবর্তী ঘটনাগুলো ঠিক পরের পর্বেই চলে এসেছে; আবার কখনো হয়তো পর পর লেখা দু’টো পর্বের ঘটনাগুলোর সময়ের ব্যবধান ছিল ৫ বৎসর। তবে পর্বগুলিতে বর্ণিত ঘটনা বা অভিজ্ঞতাগুলো সব আমার নিজের জীবনের – এটাই বিভিন্ন পর্বের ঘটনা বা অভিজ্ঞতার মাঝের প্রধান যোগসূত্র। যাহোক, গত পর্বটা (সমুদ্রে জীবন – ১৬) ছিল একটু অন্য ধরনের – যে জন্য ঐ পর্বের শুরুতে আমি বলেছি যে, ঐ পর্বের শিরোনামটা “সমুদ্রে জীবন” না হয়ে বরং “সমুদ্রগামীদের জীবন” হলে হয়তো যথার্থ হতো! ঐ পর্বটা পড়ে, এক ভাই বার্তায় আমাকে আরেকজন ব্লগারের একটা পোস্ট দেখতে বললেন এই বলে যে, তার মতে ঐ পোস্টকে আমার পোস্টের একপ্রকার anti-theses বলা যায়। কথিত বিপরীত মতের পোস্টটাতে গিয়ে দেখলাম, ব্লগার সমালোচনা করেছেন আমাদের সেকেলে ও হীন মন-মানসিকতার:যেখানে একজন উপার্জন করবে (বিশেষত প্রবাসী হলে) – আর বাকীরা বসে বসে খাবে, এমন একটা প্রত্যাশা চলে আসে পরিবারের অকর্মণ্য সদস্যদের মাঝে। পোস্টটাতে চোখ বুলিয়ে আমার মনে হলো না যে, ঐ পোস্টটা যার, তিনি আমার পোস্ট পড়ে প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কিছু লিখেছেন – অথবা – আমরা যে, অভিন্ন কোন বিষয় নিয়ে দু’টো বিপরীত অবস্থান থেকে কথা বলছি – তাও আমার মনে হয় নি! যাহোক, তখন আমি বুঝলাম যে আমার পোস্টের বিষয় বস্তু, অর্থাৎ: বাবা-মার জীবন নিংড়ে দেয়া সমর্থনের বদৌলতে, আল্লাহর ইচ্ছায়, যখন সন্তানের জীবনে ঐশ্বর্য আসে তখন, ন্যূনতম কৃতজ্ঞতা না দেখিয়ে সেই ঐশ্বর্য দূর কোন পরবাসে গিয়ে নিজ স্ত্রী ও সন্তান সহ ভোগ করার যে phenomenon – তা নিয়ে বোধহয় আরেকটু বলার রয়েছে। কেন পশ্চিমা কাফির সভ্যতার his his whose whose মনোবৃত্তির সাথে, বিশ্বাসী মুসলিম সমাজে বেড়ে ওঠাদের চলনে, বলনে, চিন্তায়, চেতনায় ও কর্মে তফাৎ থাকাটা যে বাঞ্ছনীয় – তাও বোধহয় আরেকটু খোলাসা করার প্রয়োজন রয়েছে।

আমি সমুদ্রে আমার কর্মজীবনের শেষ বা সর্বসাম্প্রতিক ১৫ বছর যে কোম্পানীতে ছিলাম, সেটা সিঙ্গাপুরের অত্যন্ত সম্মানিত একটা কোম্পানী – যা নিয়ে সেখানকার মানুষদের একটা প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ রয়েছে। আমার সেই কোম্পানী হঠাৎই এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নামী/দামী জাহাজের কোম্পানীটা কিনে নিল। মার্কিন ফ্ল্যাগে মার্কিনীদের দিয়ে জাহাজ চালানো যে, “শ্বেত হস্তী” পোষার মত – তা জাহাজ ব্যবসায় সম্বন্ধে যাদের সামান্যতম ধারণা রয়েছে – তারা জেনে থাকবেন। অফিসার ও রেটিংদের শক্তিশালী ইউনিয়ন, পৃথিবীর যে কোন দেশের তুলনায় তাদের কয়েকগুণ বেশী বেতন/ইনস্যুরেন্স ইত্যাদি, আমেরিকান ফ্ল্যাগে জাহাজ চালাতে হলে আরোপিত কঠোর শর্তাবলী – এসব হচ্ছে “শ্বেত হস্তী” পোষার পর্যায়ে যাবার কারণগুলোর অন্যতম কয়েকটি। তবে যুদ্ধকালীন জরুরী অবস্থায়, সরকার তাদের প্রয়োজনে জাহাজগুলোকে ব্যবহার করবে, এই শর্তে উল্লিখিত কোম্পানীটি কিছু বাড়তি সুবিধাও পেয়ে থাকে। যাহোক, আমাদের সিঙ্গাপুরী কোম্পানী, আমেরিকান ঐ কোম্পানীটি কিনে নেবার পর সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা পাবার জন্য হিসাব-নিকাশ কষে ঠিক করে যে, আমেরিকান কোম্পানীটির নাম তারা অপরিবর্তিত রাখবে, আগে আমেরিকানদের মালিকানাধীন যে জাহাজগুলো ছিল – সেগুলোর একাংশ আমেরিকান ম্যানেজমেন্ট ও ফ্ল্যাগে রেখে, বাকীগুলো পর্যায়ক্রমে সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ও ফ্ল্যাগে নিয়ে আসবে…..ইত্যাদি! এরই একটা অংশ হিসাবে আমাদের (সিঙ্গাপুরী) কোম্পানী, যে জাহাজগুলোর ম্যানেজমেন্ট সিঙ্গাপুরে নিয়ে আসতে চায়, সেগুলোতে অডিটর পাঠায় – সেগুলোর “কন্ডিশন” মূল্যায়নের জন্য। ঐ জাহাজগুলোর ভিতর একটা জাহাজ takeover করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে তারা আমাকে ঐ জাহাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অন্য জাতীয়তার ক্রুদের কাছ থেকে বা অন্য ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে জাহাজ takeover-এর পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার ছিল, কিন্তু এখানে যে ব্যাপারগুলো একটু ভিন্ন ছিল সেগুলো হচ্ছে: প্রথমত, (আমার ধারণায়) আমেরিকানদের মত একটা snob জাতীয়তার ক্রুদের কাছ থেকে জাহাজটা বুঝে নিতে হবে, যারা, সবকিছু জেনে ও বুঝে নেয়ার ব্যাপারে আমাকে কতটুকু সহযোগিতা করবে, সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ ছিল। আর, দ্বিতীয়ত, আমাকে বেশ কিছুদিন তাদের সাথে একটা বৈরী(??) পরিবেশে sail করতে হবে। এসব সত্ত্বেও দু’টো ইতিবাচক দিক ছিল:১) আমাকে সিঙ্গাপুর অফিস থেকে পাঠানো হচ্ছে – যারা ঐ পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দু’টো সাইডেরই মালিক-পক্ষ। ২) আমার সাথে সিঙ্গাপুরী মালয় মুসলিম আরেকজন সহকর্মী থাকবে – যার সাথে প্রাণ খুলে দু’টো কথা বলা যাবে। আমাদের কোম্পানীর সিনিয়র অফিসাররা সবাই একে অপরকে নামে চিনতো/চিনে – এমন কি কখনো দেখা না হয়ে থাকলেও। তার কারণ ছিল প্রতি মাসে, কোন সিনিয়র অফিসার কোন জাহাজে রয়েছে, সেই তথ্য সমেত একটা fleet update সকল জাহাজে পাঠানো হতো হেড অফিস থেকে। আমার সহযাত্রী এবং আমার চেয়ে পদমর্যাদায় এক ধাপ নীচের জামালকে, হেড অফিসে ব্রিফিং পর্বে প্রথম দেখলেও মনে হলো যেন কত দিনের চেনা! সিঙ্গাপুর থাকা অবস্থায়ই তার হিজাবী স্ত্রী `আইনীর সাথেও আলাপ হলো। নামাজী স্বামীর সাথে অচেনা জগতের যাত্রায় একজন সিনিয়র “মুসলিম” ভাই থাকবেন জেনে সেও আশ্বস্ত হলো।

পূর্ব নির্ধারিত দিন-ক্ষণে আমরা দুজন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটা ফ্লাইটে লস এঞ্জেলেস রওয়ানা হলাম। ওখানে পৌঁছালে নিয়োজিত হ্যান্ডলিং এজেন্ট আমাদের আভ্যন্তরীণ টার্মিনালে নিয়ে গেল। কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করার পর সেখান থেকে আভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে আমরা গেলাম Oakland-এ। সেখানে কোম্পানীর এজেন্ট আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। সে আমাদের জানালো যে, আমাদের উদ্দিষ্ট জাহাজখানি Mexico-তে আটকে পড়েছে – এটাই যেহেতু ঐ “run”-এ জাহাজখানার শেষ call, তাই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী সময় লাগছে তার ঐ পোর্টে। এজেন্ট আমাদের একটা মাইক্রোবাসে করে পাশের বড় শহর, San Francisco-র পর্যটক আকর্ষণ Fisherman’s Wharf সংলগ্ন Tuscon Inn নিয়ে তুললো। বুঝলাম আমাদের ওখানে ৩ দিনের বেশী থাকতে হবে জাহাজের অপেক্ষায় – জাহাজীদের জন্য ব্যাপারটা অনেকটা “Money for nothing”-এর মত! ফ্র্যান্সিস বেকন তার ঐ শিরোনামের লেখায়, কাজ ছাড়া অপ্রত্যাশিতভাবে কোন উৎস থেকে টাকা পেলে কি যে আনন্দ লাগে, সেটার একটা “স্বাদ” তার পাঠককে খুব সুন্দরভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। জাহাজীরা যখন অপ্রত্যাশিত ভাবে কোথাও on the house (অর্থাৎ, কোম্পানীর খরচে) কোন অবকাশ পায়, তখন তাদের অনুভূতিটা অনেকটা ঐ রকমের হয়। আমার মনে আছে ছুটি শেষে একবার, আমার কোম্পানী আমাকে একমাসের মত, পুরো বেতনে stand-by রেখেছিল! আমি ঐ অবকাশে পরিবার নিয়ে মালোয়েশিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলাম – সেখান থেকে সিঙ্গাপুর গিয়ে কয়েকদিন থেকে সময়টা শেষ হলে, আমি অফিসে রিপোর্ট করি, আর ওরা দেশে ফিরে আসে। আমাদের গোটা বেড়ানোর tripটাই সে দিক থেকে on the house ছিল – আর সেজন্য ঘোরাঘুরির আনন্দের মাত্রাটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিই ছিল মনে হয়। যাহোক, Tuscon Inn-কে ওরা মোটেল বলে, যদিও সাথে একখানা ইটালিয়ান রেঁস্তোরা ছিল – যাতে আমাদের মত ভবঘুরেদের প্রয়োজন মিটে যেতো। যে কয়দিন ওখানে ছিলাম, সে ক’দিন খাওয়া-দাওয়া ওখানেই সেরেছি – যদিও “হারাম” এড়িয়ে কি খাওয়া যায়, সেটা বেছে নিতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে।

সময়টা ছিল মার্চের মাঝামাঝি – বেশ উপভোগ্য একটা ঠান্ডা ছিল পরিবেশে ও প্রতিবেশে। আমি জানি না আপনারা যারা বাইরে থেকেছেন বা বাইরে বাইরে ঘুরেছেন – তাদের কেমন লাগে? ব্যক্তিগতভাবে আমার সবসময়ই নিজের দেশের চেয়ে ঠান্ডা আবহাওয়াকেই উপভোগ্য মনে হয়েছে। সেজন্যই বোধকরি বিষুবরেখা অঞ্চলের দেশগুলো একধরনের স্বতন্ত্র ও অদ্ভুত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও, ওসব দেশে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করাটা বেশ ক্লান্তিকর মনে হয়েছে আমার কাছে। যাহোক, কি যেন একটা ছুটি উপলক্ষে Fisherman’s Wharf-এর আশপাশের এলাকাটাতে তখন উৎসবের আয়োজন ছিল – আয়োজন বলতে আমাদের দেশে যেমন মেলা বসে, তেমনি অনেক অস্থায়ী দোকানপাট – যার মাঝে খাবার দোকান আর বাচ্চাদের জন্য খেলার বা মজা করার আয়োজন উল্লেখযোগ্য: সবদিকে কেমন সাজো সাজো রব – অন্তঃসারশূন্য সমাজের আনন্দের আয়োজনগুলোও কেমন অন্তঃসারশূন্য হয়! মেলায় আসা অনেকেই আরো দু’টো বিষয় দেখার সুযোগের সদব্যবহার করছিলেন। একটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটা পুরানো পরিত্যাক্ত সাব-মেরিন যা সাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল – আরেকটা ছিল ২২ একর আয়তনের এককালের “কারাগার দ্বীপ” Alcatrez – যার উপর ভিত্তি করে নিকোলাস কেজ ও শ্যোন কনেরী অভিনীত বিখ্যাত ছবি: The Rock[১] বানানো হয়েছিল – টিকিট কিনে লঞ্চে করে অনেকেই সেই দ্বীপ দেখতে যাচ্ছিলেন। আমি অবশ্য দুইটার কোনটাতেই যাই নি! আমি বরং ওখান থেকে (যতদূর মনে পড়ে ২৪ বা ২৬ ডলার মূল্যের) San Francisco-র একটা guided tour-এ যোগ দিয়েছিলাম।

2

এককালের “কারাগার দ্বীপ” Alcatrez

3

গাইডেড ট্যুরের ট্রলি

San Francisco শহরে ঐতিহ্যবাহী ট্রাম সার্ভিস রয়েছে। সেই ট্রামের একটা carriage-এর আদলে বানানো মটরযানকে ওরা বলে trolley। আমাদের guided tour-এর trolley-র কৃষ্ণাঙ্গ চালক তথা গাইড মাইক্রোফোনের মাধ্যমে, আমাদের, তার ট্যুর সম্বন্ধে জ্ঞান দান করতে করতে যাত্রা শুরু করলেন। ঐ trolleyতে করে San Francisco শহরের উল্লেখযোগ্য ট্যুরিস্ট আকর্ষণগুলো ছুঁয়ে এগিয়ে চললো আমাদের guided tour। বেশ কিছু জায়গায় trolleyটা থামলো – কিছু মানুষ নামলেন আবার কিছু উঠলেন। পরে বুঝলাম, আধাঘন্টা পর পর একই রুটে একটা করে trolley আসতে থাকে, আপনি চাইলে কোন একটা স্পটে, একটা থেকে নেমে পড়ে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পরের একটা trolley ধরে loop-এর পরবর্তী গন্তব্যের যে কোনটিতে যেতে পারেন। শহরের মাঝ দিয়ে যেতে যেতে আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ চালক তথা গাইড জানিয়ে চলেছিলেন শহরের বিশেষ বিশেষ স্থানের মাহাত্ম্য – যেমন: চায়না টাউন কিভাবে সৃষ্টি হলো এবং সেখানে এখন কি কি রয়েছে, কোথায় কোন ছবির শুটিং হয়েছিল, কোন ক্যাফেতে নতুন ধারা সঙ্গীতের উদ্ভাবক দল Santana রোজ সন্ধ্যায় বাজাতো, রাস্তায় দেখা যাওয়া বড় ফাটলটির জন্য কত সালের ভূমিকম্প দায়ী ইত্যাদি ইত্যাদি। San Francisco শহরে এক সময় চীন থেকে অনেক সস্তা-শ্রমিক আমদানী করা হয়েছিল রেল-পথ স্থাপনের জন্য – তাদেরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল ওখানকার “চায়না-টাউন”। পৃথিবীর বহু বড় বড় শহরেই “চায়না-টাউন” দেখা যায়, আর এটাও দেখা যায় যে, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা ট্যুরিস্টরা সেখানে ভীড় করেন – জড়ি-বুটিসহ নানা প্রকার “অপ্রচলিত” পণ্য, খুব সম্ভবত একটা প্রধান আকর্ষণ হিসেবে কাজ করে থাকবে! অনেকেই সেদিন সেখানে নেমে পড়লেন, আমিও নামলাম। এর পরের trolleyতে করে কিছুদূর গিয়ে আবার নামলাম San Francisco-র Fine Arts Museum -এ – জায়গাটা সবুজ আর ছায়াঘেরা – বেশ একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষকে ভুলানোর যে ক’টা ট্র্যাপ রয়েছে পৃথিবীতে, তার মাঝে একটা হচ্ছে “আর্ট” বা “কলা” – সকল প্রকার কলা: চিত্রকলা, শিল্পকলা, চারুকলা। আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন যে, art শব্দটির বিপরীত হচ্ছে artless যার একটা অর্থ হচ্ছে natural! “কলা” বলতে যা কিছু বোঝায়, সেটাকে “হৃদয়-বৃত্তি” বা “সুকুমার-বৃত্তি” বলে মনে করি আমরা – কিন্তু আসলেই কি তাই? স্কুল কলেজে থাকতে আমিও তাই মনে করতাম, কিন্তু পরিণত বয়সে বুঝেছি – ব্যাপারগুলো আসলে যেমন মনে করা হয় তেমন নয়। বরং “কলা-গোত্রীয়” মানুষজনের কাজের “ফিল্ড” হচ্ছে মানুষের হৃদয় ও আবেগ। এরা আম-জনতা বা “ম্যাঙ্গো-পিপলের” হৃদয়ের তন্ত্রীগুলোকে টানা-হেঁচড়া করে ও তাদের হৃদয়ে সত্য-মিথ্যা আবেগ সৃষ্টি করে তাদের কাছে – “হৃদয়ের খোরাক”, “প্রাণের খোরাক” বা “মস্তিষ্কের খোরাক” ইত্যাদি নানা বাহারী নামের আড়ালে, নিজেদের “প্রোডাক্ট” বিক্রী করে থাকে! পৃথিবীর music industry-র দিকে তাকালেই এই সত্য যে কারো অনুধাবন করতে পারার কথা! আল্লাহ্ সুবহানাহু তা’লা এদের একটা গ্রুপের (কবিদের) কথা কুর’আনে কি সুন্দর বর্ণনা করেছেন:

“আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দেব, কার নিকট শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? তারা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক চরম মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। তারা কান পেতে থাকে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। আর বিভ্রান্তরাই কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি লক্ষ্য করো নি যে, তারা প্রত্যেক উপত্যকায় উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়? আর নিশ্চয় তারা এমন কথা বলে, যা তারা করে না।” (কুর’আন, ২৬:২২১~২২৬)

এই কথাগুলো যে “কলা-গোত্রের” অন্যান্য উপদলের বেলায় প্রযোজ্য – তা বলাই বাহুল্য! ছেলেবেলায় একটা কথা শুনে বড় হয়েছি: যারা গান আর ফুল ভালোবাসে না, তারা অনায়াসে মানুষ খুন করতে পারে। পরিণত বয়সে বুঝেছি যে, ব্যাপারটা আসলে বোধহয় উল্টো – যারা মানুষ খুন করে তারাই বরং গান বা ফুল বেশী বেশী ভালোবাসে – হয়তো জীবনের রুক্ষতা কাটাতে তাদের সে সব দরকার হয়! জীবনে প্রথমবারের মত যখন (পশ্চিম) জার্মানীতে ও জাপানে যাই, তখন কথাটা মনে হয়েছিল। এই দু’টি দেশে প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে বা বাড়ীর সামনে ফুল ও ফুলগাছের সমাহার নজর কেড়ে নেয় – আর এই দু’টো দেশের মানুষকেই আমার classical music-এর (অনেক ঠাট্টাচ্ছলে যেটাকে “পোঁচানো” বলে থাকেন, সেটার) সবচেয়ে বড় সমঝদার মনে হয়েছে! অথচ, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্মম ঘটনাগুলোর সাথে এরা সম্পৃক্ত এবং নিষ্ঠুর জাতি হিসেবে এরা সর্বজন স্বীকৃত! আজো নাৎসিদের কাহিনী শুনলে অনেকের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে; আর ২য় বিশ্বযুদ্ধের ৬৭ বছর পরেও – কৃত অত্যাচার-অনাচারের জন্য জাপান যেন সরকারীভাবে ক্ষমা চায় – সেটা এখনো চীন, কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মত ভুক্তভোগী দেশগুলোর দাবী! মুসলিমদের উচিত এই কথাগুলো মনে রাখা এবং সকল প্রকার “কলা” সম্বন্ধে সাবধান থাকা। তাদের মনে রাখা উচিত যে, ঠিক যেমন একটা যন্ত্রের প্রস্তুতকারক অন্য কারো চেয়ে ভালো জানেন যে, ঐ যন্ত্রের smooth operation এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কি কি করণীয় ও বর্জনীয়, তেমনি তাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’লাই সবচেয়ে ভালো জানেন: মানব দেহ-মনের মঙ্গল – দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল কিসে নিহিত রয়েছে! তিনি যা বারণ করেছেন, তা পরিত্যাগের মাঝেই আমাদের মঙ্গল, আর তা পরিত্যাগ না করার মাঝেই আমাদের ধ্বংসের কারণ নিহিত – নিশ্চিতই নিহিত! আমরা – সময়ের বা জীবনের বর্তমান প্রস্থচ্ছেদে দাঁড়িয়ে তা বুঝি বা না বুঝি! ব্যভিচার থেকে যে এইডস, হেপাটাইটিস-বি, সিফিলিস, জরায়ূ ক্যান্সার ইত্যাদি হবে বা হতে পারে – তা আমরা জেনেছি গতকাল, আর তিনি জানেন মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগেই, কারণ, তিনি আমাদের তথা এই মহাবিশ্বের সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা! তাই revealed knowledge বা truth হচ্ছে absolute knowledge বা truth – এই কথা মনে রেখে আমরা তাঁর সকল আদেশ ও নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবো ইনশা’আল্লাহ্! এমনকি আমরা যদি সকল আদেশ-নিষেধের পেছনের wisdom নাও বুঝি/জানি, তবুও!! “চারু-কলা”, “শিল্প-কলা”, “নৃত্য-কলা” অথবা ছলা-কলায় ভর্তি নাটক/সিনেমা বলতে যা কিছু বোঝায়, তার প্রায় সবকিছুই আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ প্রকরণের ভিতর পড়বে – সুতরাং, আমারা বিশ্বাসী মুসলিমরা, অতি অবশ্যই সেসব পরিত্যাগ করবো। ২০০ বছরেরও বেশী সময়ের চেষ্টায় খৃষ্টান মিশনারীরা, ঔপনিবেশিক শক্তির প্রত্যক্ষ সহায়তায়, যা করতে পারে নি – মাত্র কয়েক বছর মুসলিমদের নির্বিচারে “কলা-সামগ্রী” গলাধঃকরণ করিয়ে ইহুদী-খৃষ্টান-মুশরিকরা তা অর্জন করেছে – মুসলিম জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশকে তারা “কার্যত-কাফির”-এ রূপান্তরিত করেছে: আজ যাদের অনেকেই আল্লাহর কথার উপর দিয়ে “মিডিয়া”র কথায় বিশ্বাস করে – শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ বা অরুন্ধতীর কথা যাদের কাছে কুর’আনের কথার চেয়ে প্রিয় বা গুরুত্বপূর্ণ!

আমি আমার মূল প্রসঙ্গ থেকে অনেকটুকুই সরে এসেছি, সেজন্য দুঃখিত – তবে, আলহামদুলিল্লাহ্, আমি আমার ব্লগিং-এর উদ্দেশ্য ও অভীষ্টের অক্ষেই রয়েছি – যা কি না আমি আমার একটা পোস্টে ( দেখুন: Click This Link ) খোলাখুলিভাবে সবাইকে জানিয়েছি। আরেকটা ছোট্ট গল্প বলে “কলা” প্রসঙ্গের ইতি টানবো ইনশা’আল্লাহ্! আমার প্রয়াত ভাইয়ের একজন সিনিয়র অফিসার ছিলেন, যিনি তার “সোনার ছেলে” স্ট্যাটাসের বলে টেলিভিশনের জনৈকা সেলিব্রেটিকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের কিছুদিন পর ঐ “কলা-গোত্রীয়” সুন্দরী তাকে ত্যাগ করেন। তিনি তখন তার অবিবাহিত জুনিয়র অফিসারদের বলতেন: ঐ মিয়া “চিত্র-কলা”, “চারু-কলা”, “শিল্প-কলা” এই ধরনের যত ‘কলা” আছে এইসবের ধারে কাছেও যাইও না – শ্যাষে “কাঁচকলা” হাতে ধরায়্যা দিয়া চইলা যাইবো। বহু বছর পরে আজো কথাগুলো মনে হলে হাসি পায় – অথচ কি নিদারুণ একটা সত্য তিনি অনুধাবন করেছিলেন। যাহোক, এবার লেখার মূল ধারায় ফিরে যাওয়া যাক!

ঐ guided tour-এ এরপর আমি নেমেছিলাম “golden gate” সেতুর ঠিক নীচে যে পার্কটা রয়েছে – ঐ পার্কটায়। সেখান থেকে হেঁটে “golden gate” সেতুতে উঠে যাওয়া যায়। সেতুর একপাশে রয়েছে পথচারীদের জন্য আলাদা একটা ছোট্ট হেঁটে চলার লেন। ঐ লেন বরাবর হেঁটে চলে গেলাম দু’টি মাত্র স্তম্ভের (বা পিলারের) একটি পর্যন্ত – San Francisco সাইডের স্তম্ভটি ছুঁয়ে ফিরে আসলাম! ছেলেবেলায় পড়েছি “golden gate” সেতু হচ্ছে পৃথিবীর আশ্চর্যতম ব্যাপারগুলোর একটি – সেই হিসাবে, সশরীরে সেটার উপর যাওয়াটাকে একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার মনে হয়েছে। আরো ভালো লেগেছে এই ভেবে যে, আর কবে San Francisco-তে আসি না আসি তা কে জানে (আমার এই অনুভূতিতে বিধাতা হয়তো হেসেছেন সেদিন, কারণ পরবর্তী সময়ে প্রতি ৪২ দিনে ঘুরে ঘুরে আমি San Francisco Bay Area-য় এত বার গিয়েছি যে, ঐ শহরটা প্রায় আমার বাড়ী-ঘরের মত হয়ে গিয়েছিল)! এভাবে on the house একটা অবকাশের সুযোগে বেশ কিছু দেখা হলো ভাবতে যে খুব ভালো লেগেছিল, তা বেশ মনে আছে! আসলে কোন ভালো মুসলিম যে সত্যিকার অর্থে এসব থেকে কোন “পুলক” অনুভব করবে না – এই সত্যটা জেনেছি অনেক অনেক পরে। এখনো অনেক অনুশীলনকারী মুসলিমও জানেন না যে, ইসলাম হচ্ছে একটা iconoclastic দ্বীন (বা ধর্ম) – যা কোন রকম icon বা ধর্মীয় image বরদাশত করে না । ইসলামের চিহ্ন বা পরিচায়ক বলে আজ আমরা যা কিছুকে জ্ঞান করে থাকি – মিনার, গম্বুজ, চাঁদ-তারা সব এসেছে মদীনার স্বর্ণযুগের অনেক পরে। আমাদের সেই শুদ্ধতা গ্রহণ করার মত অন্তরের পরিশুদ্ধতা নেই, তাই ব্যাপারটা নিয়ে উচ্চ-বাচ্য করা হয় না ঠিকই – কিন্তু অনেক বড় স্কলারই মনে করেন যে, এমন কি রাসূল(সা.)-এর কবরের উপর যে সবুজ গম্বুজ রয়েছে, সেটাও সরিয়ে ফেলা উচিত! যাহোক, এই বিষয় নিয়ে পরে কখনো বিস্তারিত আলোচনা করবো।

4

গোল্ডেন গেট সেতুর এই পিলারটা সেদিন ছুঁয়ে এসেছিলাম

তিন দিনের কিছু বেশী সময়ের আমার ঐ অপ্রত্যাশিত অবকাশের আরেকটা প্রাপ্তি ছিল, ইসলামের উপর কিছু দুর্লভ বই কেনা। আমি যেখানে থাকতাম তার এক ব্লক পরেই, আমেরিকার সবচেয়ে বড় দু’টো বইয়ের দোকানের একটি, Barnes and Noble-এর একটা বি-শা-ল শাখা ছিল। এত বই একসাথে কেবল পাবলিক লাইব্রেরীতে থাকতে পারে বলেই আমার ধারণা ছিল – বইয়ের দোকানে তো নয়ই। ঐ সব বইয়ের দোকানের ভিতরে বসে যত ইচ্ছা বই পড়া যায় – কেউ কিছু বলে না। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে অনেক বড়দেরও দেখা যায় ঘন্টার পর ঘন্টা ফ্রি বই পড়ছেন, নোট করছেন! ব্‌ইয়ের দোকানের অন্তর্ভুক্ত কফির দোকানে বসে কফি খেতে খেতেও অনেকে বই বা ম্যাগাজিনে চোখ বুলাতে থাকেন। ওখানে যে বইগুলো কিনি, তার ভিতরে আমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলা দু’টো বই ছিল – Daughters of Another Path এবং A Heart Turned East ।

অবকাশ শেষ হলো এক সময় – পূর্বঘোষিত সময়সূচি হিসেবে আমাদের ঐ জাহাজখানি Oakland বন্দরে ভিড়ার সময়ের সাথে মিলিয়ে, এজেন্ট আমাদের জেটিতে নিয়ে গেল। বাইরে থেকে একনজরে দেখে ভালোই লাগলো জাহাজখানা। জাপানে তৈরী বলে দেখতে বেশ পরিচিতই মনে হলো! জাহাজে পা রেখে মনে হলো একটা মৃত নগরী – আমাদের এদিককার জাহাজগুলোতে, বন্দরে আসলে দারুণ রকমের একটা প্রাণ-চাঞ্চল্য দেখা যায় – এখানে সেই প্রাণের স্পন্দনটা একেবারেই অনুপস্থিত মনে হলো। আমাদের সাথে ওদের জীবনযাত্রার পার্থক্য বোঝার পর্বের সূচনা হলো এভাবেই!

নোট:
[১] সিনেমা বলতে আমরা যা বুঝি, ইসলামের দৃষ্টিতে তা যে সন্দেহাতীতভাবে হারাম, এটা জানার আগেই ছবিটা দেখা। আজ তাই আমার লেখা থেকে কেউ যেন ধরে না নেন যে সিনেমা দেখায় কোন সমস্যা নেই (নাউযুবিল্লাহ্!), ঠিকই আছে – সেজন্য এই disclaimer!!

[২]যে জাহাজটি এবং যে প্রসঙ্গটি নিয়ে লিখতে শুরু করেছিরাম – সেটা একটা পর্বে শেষ করতে পারলাম না। তা করতে গেলে লেখাটা হয়তো বেশী বড় হয়ে যাবে। ইনশা’আল্লাহ্ আরেকটি পর্বে লেখাটার প্রসঙ্গ পূর্ণ হবে!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s